গোলাম রব্বানী, রামগতি (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরের রামগতির মেঘনা নদীর ইলিশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট চক্র। মিঠা পানির মাছ হওয়ায় মেঘনা নদীর ইলিশের স্বাদ সাগর কিংবা অন্য নদীর মাছের চেয়ে বেশি। এ কারণে ক্রেতাদের প্রথম নজর থাকে মেঘনার ইলিশের দিকে। কিন্তু এ ইলিশ নিয়ে চলছে সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নদী থেকে জেলেদের জালে ধরা পড়ার পর মাছঘাটের আড়ত হয়ে ব্যাপারীর হাত ঘুরে খুচরা বিক্রেতার কাছে যায় ইলিশ। সেখান থেকে পৌঁছে যায় ভোক্তার হাতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি দূর-দূরান্তের মোকাম, পাইকার, খুচরা বিক্রেতার হাত বদলের পর ভোক্তারা খেতে পারেন এ মাছ। এতে প্রতি হাতেই দাম বেড়ে ক্রেতা পর্যন্ত হয়ে যায় তিন-চার গুণ। ফলে মাছটি স্বল্প আয়ের মানুষের অনেকটা নাগালের বাইরে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক সমীক্ষা অনুযায়ী, জেলেদের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে ইলিশ অন্তত পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে। জেলে থেকে দাদন ব্যবসায়ী, আড়তদার, পাইকার এবং খুচরা বিক্রেতা, সেখান থেকে ভোক্তার হাতে। এসব ধাপের প্রতিটিতে দাম বাড়তে বাড়তে পকেট কাটা পড়ে ক্রেতাদের। জেলেরা তাদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রামগতিতে ২০ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। এ ছাড়া নদী ও সাগরের মাছ কেনাবেচার জন্য রামগতিতে ১০টি মাছঘাট রয়েছে। মেঘনা নদীর জেলেদের জালে ধরা পড়া ইলিশ প্রথমে ওই সব মাছঘাটে ওঠে। নিলামে বিক্রির মাধ্যমে সেখান থেকেই শুরু হয় রুপালি ইলিশের বাণিজ্যিক যাত্রা।
এদিকে কিন্তু ঘাটের আড়ৎ হয়ে ব্যাপারীদের কাছে যাওয়ার পর ইলিশের দাম দ্রুত বাড়লেও সেই বাড়তি দামের বড় অংশের সুবিধা জেলেরা কতটা পান-এ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাপারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে ইলিশের বাজার।
উপজেলার বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে জানা গেছে, রামগতি বিভিন্ন মাছঘাটে ইলিশ সাধারণত ওজন করে নয়; বিক্রি হয় নিলামে হালি বা পিস হিসেবে। ফলে নদী থেকে মাছ নিয়ে আসা জেলেরা যে দামে ইলিশ বিক্রি করেন এবং পরে একই মাছ বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, তার মধ্যে তৈরি হয় বড় ধরনের ব্যবধান। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ব্যবধানের সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট। জেলের হাত থেকে যে দামে মাছ বিক্রি হয়; আড়ত, পাইকার ও খুচরা বাজারে কয়েক ধাপ পেরিয়ে দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ঘাটের আড়তে এখান এক কেজি ওজনের ইলিশ তারা ১২০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন। সেই মাছ বিভিন্ন হাত বদল হয়ে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হয় চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। এতে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না তারা, কিন্তু ক্রেতাদের দিতে হচ্ছে তিন থেকে চার গুণ মূল্য। এতে পুরো মুনাফা চলে যাচ্ছে মাঝখানের সিন্ডিকেটের হাতে।
এ চিত্র দেখা গেছে রামগতি উপজেলার বয়ারচর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রেও। সেখানে এক কেজি ওজনের ইলিশ জেলের জালে ধরা পড়ার পর প্রথমে দাদন ব্যবসায়ীর দরবারে নেওয়া হলে মূল্য হয় ১২০০ টাকা। সেখান থেকে আড়তে দাম ওঠে দুই হাজার টাকা। ওই মাছ বাজারে নিয়ে লোকমান হোসেন নামের এক ভোক্তা কিনেছেন চার হাজার টাকা দিয়ে।
ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে দাম পড়ে জেলের পাওয়া দামের তিন থেকে প্রায় চার গুণ। এতে কয়েক ধাপে হাতবদলের কারণে অতিরিক্ত অর্থ যোগ হয়। সর্বশেষ সিন্ডিকেটের সবার পকেটে যাওয়া এ টাকা একজন ক্রেতা বা ভোক্তার পকেট থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘনায় ইলিশ ধরতে জেলেদের বড় একটি অংশ আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মাছ ধরেন। ফলে মাছ ধরে আড়তে আনার পর দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তখন দাম নির্ধারণের দায়িত্ব চলে যায় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে। এতে ন্যয্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন জেলেরা, আর চড়াদামে ওই ইলিশ বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে মুনাফালোভী সিন্ডিকেট।
আলেকজান্ডার সেন্টার ঘাটের জেলে হাসিম মাঝি বলেন, ‘দিনের পর দিন, মাসের পর মাস রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ইলিশ শিকার করি। কষ্টের সেই ইলিশ নামমাত্র মূল্যে অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছি। সিন্ডিকেট অতিক্রম করার কোনো সুযোগ আমাদের থাকে না।’ আরেক জেলে নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘একটা ট্রলার নিয়ে নদীতে গেলে দুই লাখ টাকার ওপর খরচ হয়। এই টাকা আগে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে নিতে হয়। তাই তাদের কথামতো ইলিশ শিকার করে তাদের হাতে তুলে দিতে হয়।
মৎস্যজীবী সমিতির নেতারা জানান, জেলেদের সরাসরি বাজারসংযোগ ও দাদননির্ভরতা কমাতে সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে ইলিশ বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ফিরবে, ইলিশের দামও ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে চলে আসবে। পাশাপাশি মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের নিয়মিত তাদারকি থাকলে মাছঘাটের সিন্ডিকেট ভাঙা সহজ হবে। তাদের ভাষ্য, মেঘনার ইলিশ শুধু কোনো ঘাটের ব্যবসায়ীদের পণ্য নয়; এটি নদী, জেলে ও দেশের মানুষের সম্পদ। সেই সম্পদের বাণিজ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে ইলিশের দাম বাড়লেও তার ন্যায্য সুফল জেলে পর্যন্ত পৌঁছাবে না।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির রামগতি উপজেলা সভাপতি মীর হাছান মাহমুদ মামুন বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের মৎস্য অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এ এলাকার হাজার হাজার জেলে পরিবার মেঘনার ইলিশের ওপর নির্ভরশীল। এসব জেলে নদীতে ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরেন। তিনি বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপে যুক্ত হন আড়তদার, পাইকার, দাদান ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। ফলে ইলিশের মূল্য শৃঙ্খলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নেওয়া জেলে এবং সবচেয়ে বেশি লাভ করা ব্যবসায়ী। এই দুই পক্ষের মধ্যে আয়ের ব্যবধান কতটা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর উপজেলা সম্পাদক বেলাল হোসেন জুয়েল বলেন, ‘আমাদের দেশে দেশীয় চাষের মাছ উৎপাদনে বিপুলপরিমান অর্থ খরচ হয়। পুকুর খনন, পোনা সংগ্রহ, প্রতিদিন খাদ্য সরবরাহ, পানি পরিষ্কার, রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থাসহ সব কিছুতেই নির্দিষ্ট হারে খরচ রয়েছে। বেলাল হোসেন জুয়েল আরও বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মাছ মারা গেলে লোকসানের ঝুঁকিও থেকে যায়। তবুও ইলিশের চেয়ে দেশীয় মাছের দাম কম। কিন্তু ইলিশ মাছ প্রকৃতি থেকে পাওয়া যায়। কোনো পুকুর, পোনা ও খাবার নেই। শুধু জেলেদের নৌকা, জাল আর শ্রমই মূল পুঁজি। তবুও বাজারে ইলিশের দাম অনেক বেশী। এতে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে ইলিশের দাম বাড়ার ব্যাপারটি কৃত্রিম।
জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জেলেদের জালে আশানুরূপ ইলিশ ধরা না পড়ায় দাম এখন কিছুটা বেশি। অল্প দিনের মধ্যে জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করা যায়। তখন দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে। এই মৎস্য কর্মকর্তা আরো বলেন, মাছঘাটে ইলিশ বিক্রি হওয়ার পর পাইকার ও খুচরা পাইকাররা ইলিশের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে ইলিশ মাছ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে চলে যায়। এসব নিয়ন্ত্রণে মৎস্য বিভাগ কাজ করছেন।
Md Abu Sayed