রেজাউল হক, রামগতি ব্যুরো চীপ: ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনা নদীতে ইলিশ সহ বিভিন্ন প্রজাতির সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করে সরকার। এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন মাছঘাটে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে একাধিক সিন্ডিকেট চক্র অবাধে মা ইলিশ শিকারের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। প্রশাসনের ঢিলেঢালা অভিযানের সুযোগ নিয়ে মেঘনায় মা ইলিশ শিকারের রীতিমতো উৎসবে নামেন রাজনৈতিক সিন্ডিকেট চক্রগুলো । এসব ইলিশ কিনার জন্য সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে শত শত ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার বেশ কয়েকটি মাছঘাটে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। রামগতি উপজেলার বিবিরহাট ওছখালী, ব্রীজঘাট, আসলপাড়া, টাঙ্কিরঘাট, আলেকজান্ডার, বালুরচর, বাংলা বাজার ও কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, নবীগঞ্জ, নাজিরগঞ্জ, মাতাব্বরহাট, লুধুয়া ও পাটারিরহাট এলাকার মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নির্বিচারে চলছে মা ইলিশ শিকার।
গোপন সংবাদের ভিক্তিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর রামগতি বাজার মাছঘাট সংলগ্ন মান্তাপাড়া নামক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাছ কিনতে প্রচুর বেপারি অপেক্ষামান। সাংবাদিকদের উপস্থিত দেখে বেশ কয়েকজন বেপারী মোটরসাইকেল নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
এসময় স্থানীয় জেলে ও মাছ বেপারীরা জানান, বিকেলে ৮ থেকে ১০ টি নৌকা মাছ শিকারে নদীতে যায়। রাত ৭ টা থেকে ৮ টার মধ্যে মাছ নিয়ে তারা ঘাটে আসে। তাদের অপেক্ষা ক্রেতা ও বেপারী দাঁড়িয়ে রয়েছে। আবার সারারাত ধরে ১২ থেকে ১৫ টি নৌকা মাছ শিকার করে ভোরে ঘাটে আসে। তখন মানুষের ভীড় আরও বেশী হয়। এসব নৌকা কার বা কাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এমন প্রশ্নের উত্তরে উপস্থিত তিনজন বেপারি জানান, এগুলো লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।
এছাড়া কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটে চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি হুমায়ুন কবির ও ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে ৫ থেকে ৭ টি নৌকা নদীতে মা ইলিশ শিকার করছে বলে অভিযোগ উঠে।
স্থানীয়রা জানান, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় মা ইলিশ ধরার মহোৎসব। চলে সারারাত ধরে। এবং রাতে বেশ কিছু নৌকা ও ট্রলার নিয়ে জেলেরা ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে পড়েন মেঘনায়। নদীতে নামা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছাত্রদল নেতা জাহাঙ্গীর, ডলার নোমান ও হালিম মাঝির সিন্ডিকেট চক্র তাদেরকে নদীতে মাছ শিকারের সহায়তা করছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ টির মত ছোট বড় ও মাঝারি নৌকা মেঘনায় মাছ শিকার করে। রামগতি বাজার মাছঘাট সংলগ্ন মান্তাপাড়া নামক এলাকায় জাহাঙ্গীরের পরিচালিত এ সিন্ডিকেটের সাথে চরগাজী ও বড়খেরী ইউনিয়ন ছাত্রদল ও যুবদলের বেশ কয়েকজন নেতাও জড়িত রয়েছে বলে জানান ওই এলাকার দুইজন বিএনপি নেতা।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিএনপির ওই দুই নেতা বলেন, এগুলো বললে সমস্যা হয়। দলের নেতাকর্মীরা এতো বেপরোয়া হয়ে গেছে, কেউ কারো কথা শুনতে চায়না। মৎস্য অফিস ও নৌ পুলিশকে ম্যানেজ ছাড়া এ ধরনের কাজ করা অসম্ভব।
মাছ কিনতে আসা সিরাজ উদ্দিন, রফিক মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার এ সময়ে তারা প্রায় এসে এ স্থান থেকে মাছ নিচ্ছেন। শুধু তারা নয়, প্রায় ২ শতাধিক বেপারি নিয়মিত মাছ ক্রয় করছেন। পেটের দায়ে এবং ঋণের কারণে জেলেরা নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছে। পুলিশ সহ সকল সাইড ম্যানেজের দায়িত্ব রয়েছেন ছাত্র নেতা জাহাঙ্গীর আলম, ডলার নোমান ও হালিম মাঝি।
স্থানীয় রামগতি বাজারের ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেন অভিযোগ করেন, এ বছর মা ইলিশ ধরা রুখতে নিষেধাজ্ঞাকালীন প্রশাসনের তৎপরতা এতটা ঢিলেঢালা, যা নজিরবিহীন। বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনের কড়াকড়ি আরও বেশী ছিল। যার কারণ নির্বিচারে ইলিশ শিকার হচ্ছে।
প্রসঙ্গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশ সংরক্ষণের জন্য চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকাসহ দেশের সকল নদ-নদীতে সব ধরনের ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ করে সরকার।
অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনীতি করার কারণে তার পক্ষে বিপক্ষে শত্রু রয়েছে। তারা হয়তো এমন অভিযোগ করলেও করতে পারে। তবে তিনি এ কাজের সাথে জড়িত নন।
রামগতি উপজেলা ছাত্রদলের আহবায়ক শিবলী নোমান বলেন, সরকারের আইন অনুযায়ী ২২ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এসময় কেউ যদি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে নদীতে মাছ শিকারে সহায়তা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। এতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। অপরাধীর পরিচয় অপরাধী।
রামগতির বড়খেরী নৌ-পুলিশের ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, জনবল সংকট সহ নানা কারণে এ বিশাল নদী পাহারা দিয়ে রাখাটা কষ্টকর। তবুও সাধ্য অনুযায়ী নৌ-পুলিশের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, এ নামগুলোর কথা আমিও শুনে আসছি। গত দুইদিন ধরে আমি ওই স্থানে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে টেলিফোনে সতর্কও করেছি। কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। আজ থেকে অভিযান কঠোর করা হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে আমরাও শুনেছি। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
Md Rassel Patwary